লজ্জা ৷ তাও আবার প্রজাতন্ত্র দিবসেই ৷ নিজের মেয়েকে বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল স্বামী সহ শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা ৷ পেটের সন্তানকে বিক্রি করতে চাননি মা৷ তাই শীতের রাতে কোলের মেয়ে সহ স্ত্রীকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় স্বামী ৷ রাতে ওই বধূ মেয়ে কোলে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে বসতে বাধ্য হয়েছিলেন ৷ তা দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় এক গৃহবধূ ৷ মানবিকতার খাতিরে বাচ্চা সহ মা’কে নিজের বাড়ির পাশে একটি গ্যারেজ ঘরের বারান্দায় আশ্রয় দেন ৷ রাতে নিরাশ্রয় বধূকে খেতেও দেন তিনি ৷ খবর পেয়ে এদিন বাচ্চা সহ ওই বধূকে সরকারি হোমে নিয়ে যায় পুলিশ ৷ কোনও প্রত্যন্ত এলাকার ঘটনা নয় ৷ এই ঘটনার সাক্ষী থেকেছে খোদ মালদা শহরের রবীন্দ্র ভবন সংলগ্ন এলাকার মানুষজন ৷
নিরাশ্রয় ওই বধূর নাম কবিতা কর্মকার ৷ বয়স মাত্র ২৭ ৷ এই বয়সেই তিনি পৃথিবীর অনেক কালো দিক যেন দেখে ফেলেছেন ৷ তাঁর
বাবার বাড়ি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট সংলগ্ন কামারপাড়া গ্রামে ৷ বাবা শিবু কর্মকার শ্রমিক ৷ ভিন রাজ্যে কাজ করেন তিনি ৷ মা মারা গিয়েছেন ছোটোতেই ৷ কবিতার দুই দাদা ৷ স্বপন ও পলাশ ৷ দুজনেই ভিন রাজ্যের শ্রমিক ৷ কর্মসূত্রে শিবুবাবু একসময় দিল্লিতে থাকতেন ৷সেখানেই তিনি মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন মোহন কর্মকার নামে এক শ্রমিকের সঙ্গে ৷ কবিতার সঙ্গে মোহনের বিয়েও হয়ে যায় ৷ কিন্তু মোহন ছিল মদ্যপ, দুশ্চরিত্র ৷ বিয়ের ৬ মাসের মধ্যে কবিতাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় সে ৷ ততদিনে মোহনের বীজ নিজের গর্ভে ধারণ করে ফেলেছেন কবিতা ৷ সেই অবস্থাতেই তিনি চলে আসেন কামারপাড়ায় ৷ সেখানেই এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি ৷
কবিতা জানান, মেয়ে নিয়ে তিনি কামারপাড়া গ্রামে ভালোই দিন কাটাচ্ছিলেন ৷ তার কিছুদিনের মধ্যেই বুবাই কর্মকার নামে এক
যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় ৷ বুবাইয়ের বাড়ি মালদা শহরের রবীন্দ্র ভবন সংলগ্ন এলাকায় রেল লাইনের ধারে ৷ সে’ও শ্রমিক ৷ ভিন রাজ্যে কাজে যায় ৷ পরিচয় থেকে তাঁদের দুজনের প্রেম হয় ৷ একসময় বুবাই তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় ৷ তিনি একটি শর্তেই বুবাইকে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন ৷ তা হল, তাঁর মেয়েকে নিজের বাড়িতে জায়গা দিলে তবেই তিনি তাকে বিয়ে করবেন ৷ তাঁর শর্তে রাজি হয় বুবাই ৷ এরপর তাঁদের বিয়ে হয়ে যায় ৷ কিন্তু বিয়ের পর বুবাই ও তার মা পার্বতী কর্মকার তাঁর প্রথম পক্ষের মেয়েকে দেখতে পারত না ৷ অকারণে তাকে মারধর করত ৷ দু’বেলা তাকে ঠিকমতো খেতেও দিত না ৷ এভাবেই তাঁর দিন কাটছিল ৷ এরই মধ্যে বছর খানেক আগে বুবাই তাঁকে নিয়ে দিল্লিতে শ্রমিকের কাজ করতে যায় ৷ সেখানে তিনি মেয়েকে নিয়ে যেতে না চাইলেও বুবাই ও তার মা জোর করে তাঁদের সঙ্গে মেয়েকে দিল্লি পাঠিয়ে দেয় ৷ একদিন সেখানে বুবাই তাঁর মেয়েকে তাঁর সামনেই গলা টিপে ও মাথায় ইটের আঘাত করে খুন করে ৷ খবর পেয়ে পুলিশ বুবাইকে ধরে নিয়ে যায় ৷ তিনি নিজের হাতে মেয়েকে মাটি দেন ৷ সেখান থেকে ফের চলে আসেন মালদায়৷ তিনি গোটা ঘটনা তাঁর শাশুড়িকে জানান ৷ কিন্তু শাশুড়ি তাঁর কোনও কথা শুনতে চাননি ৷ তিনি তাঁর মাথায় স্বামী হত্যার অপবাদ দেন ৷ এরই মধ্যে বুবাই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দিল্লি থেকে বাড়ি ফিরে আসে ৷ মাসখানেক আগে তিনি বুবাইয়ের মেয়ের জন্ম দেন ৷ কিন্তু মেয়ে হওয়ায় তাঁর উপর অশান্তি শুরু হয় ৷ অকারণে প্রতিদিন মারধর করা হত তাঁকে ৷ খেতেও দেওয়া হত না ৷
কবিতার অভিযোগ, সংসারের গরিবি দূর করতে বুবাই ও তার মা তাঁর সন্তান বিক্রি করে দেওয়ার ফন্দি আঁটে ৷ দুজনেই তাঁকে জানায়, মেয়েকে তারা বিক্রি করে দেবে ৷ এক গ্রাহকের সন্ধান মিলেছে ৷ মেয়ের বিনিময়ে সে তাদের মোটা টাকা দেবে ৷ কিন্তু তিনি পেটের সন্তানকে বিক্রি করতে দেবেন না বলে পণ করেন ৷ এরপরেই এদিন সন্ধ্যায় তাঁর স্বামী ও শাশুড়ি মেয়ে সহ তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় ৷ কিছুক্ষণ পর তিনি বাড়ি ফিরে গেলে তারা তাঁকে প্রশ্ন করে, তিনি মেয়েকে বিক্রি করেননি কেন ? তারা আবার তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় ৷ তিনি জাতীয় সড়কের ধারে বসেছিলেন ৷ সেই সময় এক মহিলা তাঁকে আশ্রয় দেন ৷
সন্তান কোলে এক নিরাশ্রয় বধূর রাস্তার ধারে বসে থাকার খবর পেয়ে এদিন ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ইংরেজবাজার থানার পুলিশ ৷ সমস্ত
ঘটনা শুনে পুলিশ আধিকারিক কবিতা ও তাঁর মেয়েকে এদিন সরকারি হোমে নিয়ে যান ৷ এখনও পর্যন্ত কবিতা তাঁর স্বামী কিংবা শাশুড়ির বিরুদ্ধে পুলিশে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি ৷ তবে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বুবাই ও তার বাড়ির লোকজনের কঠোর শাস্তি চান ৷ তবে তিনি আর বাবার বাড়ি ফিরে যেতে চান না ৷ কারণ, এখন সেখানে আর কেউ নেই ৷
রাতে কবিতাকে আশ্রয় দেওয়া গৃহবধূ রানি সিং বলেন, শীতের রাতে বাচ্চা কোলে নিয়ে কবিতাকে রাস্তার ধারে বসে থাকতে দেখে তিনি আর চুপ করে থাকতে পারেননি ৷ তাই তিনি মা ও মেয়েকে নিজের বাড়ির পাশে একটি গ্যারেজের বারান্দায় আশ্রয় দিয়েছিলেন ৷ রাতে তাদের
খাবারের পাশাপাশি শীতবস্ত্রেরও ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি ৷ এদিন সকালে কবিতা ও তাঁর মেয়ের পাশে দাঁড়ান স্থানীয় বাসিন্দা মানিক ঘোষ ৷তিনিও কবিতাদের একটি কম্বল দেন ৷
বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন নিচের লিংকে
https://www.youtube.com/embed/4HdHe2K0LAI