“খুব ভয় লাগে, কখন যে পরে যাই”- এক প্রকার জীবনকে হাতে নিয়ে এভাবেই বছরের পর বছর ধরে কুলিক নদীর পারাপার করে চলেছে রায়গঞ্জ ব্লকের শেরপুরের খুদে পড়ুয়ারা। তবে শুধু পড়ুয়াই নয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই নিত্য দিন নদী পারাপার করছেন নদীর দুই পাড়ের হাজার হাজার গ্রামবাসী। দুই প্রান্তের মানুষদের একমাত্র উপায় নদীর উপরে থাকা বাঁশের সাঁকো।
ডান ও বাম সব দলেরই ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী রাজ কায়েম হয়েছে। কিন্তু দুর্দশা ঘোচেনি প্রায় ত্রিশটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের। প্রত্যেক ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি মেলে পাকা সেতু নির্মানের। কিন্তু ভোট পেরোলেই সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবের রূপ পাইনা। তৈরি হয় না নদী পারাপারের সেতু। এবারও গ্রাম বাংলার ভোট চিত্রে এমনই করুন দুর্দশার ছবি ফুঁটে উঠল উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ ব্লকের শেরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের খলশী গ্রামে। তাই এবার পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে খুদে ছাত্র-ছাত্রী থেকে সাধারণ মানুষদের এক এবং একটাই দাবী, কুলিক নদীর উপর পাকা সেতু। গ্রামের কৃষকের মাঠের ফসল বাজারে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্কুলে যাওয়া আসা, পঞ্চায়েত অফিস বা বিডিও অফিস যাওয়া কিংবা মুমুর্ষ রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া সবই করতে হয় কুলিক নদীর খলশী ঘাটের উপর দিয়ে। বর্ষার সময় এই কুলিক নদী পার হতে একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় নৌকো, আর অন্যান্য সময় নদীর জল কমে গেলে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই ভরসা আশেপাশের এলাকার প্রায় ত্রিশটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের। যদিও বেশির ভাগ সময় বাঁশের সাঁকোর উপর দিয়ে সাইকেল, মোটরসাইকেল নিয়ে পারাপার করেন এলাকার বাসিন্দারা। খুদে ছাত্র ছাত্রীরা সাইকেল নিয়ে পার হয়ে এসে যেমন বলে “খুব ভয় লাগে, কখন যে পরে যাই”, তেমনি মোটরসাইকেল আরোহীরাও বলেন,”প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় এই খলশী ঘাট”। শেরপুর গ্রামপঞ্চায়েত থেকে রায়গঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতি কিংবা উত্তর দিনাজপুর জেলাপরিষদ সব স্তরেই বহু আবেদন নিবেদন তথা আন্দোলনও করেছেন গ্রামের বাসিন্দারা। প্রতিটি ভোটের মুখে নেতা-মন্ত্রীরা শুধু প্রতিশ্রুতিই দিয়ে গেছেন, কিন্তু হয়নি সেতু নির্মাণের কাজ। ফলে কয়েক দশক ধরে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকোর উপর দিয়েই চলছে গ্রামের মানুষের পারাপার। আবারও এসে গিয়েছে গ্রামবাংলা গড়ার পঞ্চায়েত ভোট। তাই এবারে গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে সঙ্গে খুদে পড়ুয়াদের দাবী কুলিক নদীর খলশী ঘাটে একটা পাকা সেতু চায়।
এবিষয়ে স্থানীয় এক স্কুল পড়ুয়া নিকিতা মণ্ডল জানায়, এই ঘাটের বাঁশের সাঁকো দিয়ে তাদের প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয়। কিন্তু তাদের খুব ভয় লাগে। যদি হঠাৎ করে এই বাঁশের সাঁকো ভেঙে পরে যায় তবে কি হবে ? তাই তাদের দাবী একটি সেতু হলে তারা নির্ভয়ে স্কুল যেতে পারবে।
এবিষয়ে স্থানীয় গ্রামবাসী ঝুমা বিশ্বাস ও ফকিরুদ্দিন সরকার জানান, প্রাণের ঝুকি নিয়ে এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন, নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলি জয়ী হবার জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়, যাতায়াতের জন্য সেতু তৈরি করে দেবে। কিন্তু ভোট প্রক্রিয়া শেষ হলেই সেতু নির্মাণের কথা ভুলে যায় তারা। এবিষয়ে তারা প্রশাসনিক স্তরে বহুবার জানিয়েছেন, এমন কি আন্দোলন পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু তৈরি হয়নি যাতায়াতের কোনো সেতু। তাদের দাবী একটি পাকা সেতু তৈরি করার।
এবিষয়ে স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক শান্তনু তিরকি জানান, এই কুলিক নদীর খলশী ঘাটের ওপারে প্রশাসনিক দপ্তর, স্কুল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এই ঘাটে সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে তারা যাতায়াতের সমস্যার মুখে পড়ছেন। এই ঘাট দিয়ে ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু বর্ষাকালে নদীতে জল থাকার কারণে প্রায় ৩০ কিলোমিটার অন্য রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন তারা।